১২ মিশালি

ছাত্রও ডাকে ভাইয়া, ছাত্রের বাবা-মাও ডাকে ভাইয়া!

অজানা রহস্য
২০১৬ সেপ্টেম্বরে মোঃপুরে একটা বাচ্চাকে পড়াতাম। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ত তখন ছেলেটা। ছাত্রের মা এসএসসি পাসের পর বিয়ে হয়ে যাওয়াতে আর পড়াশোনা করতে পারেন নি। স্টুডেন্ট বাবা ব্যবসায়ী, অনার্সে ভর্তি হয়েছিলো কিন্তু শেষ করতে পারে নাই, ব্যবসায় মনোনিবেশ করেছে আগেই।

 

বাসায় ডেকোরেশন দেখে মনে হচ্ছিল এদের একগাদা টাকাই  আছে বোধ হয়! রুচিবোধ নাই।
ছাত্রের বাবা-মায়ের সাথে কথা বলার পর উপলব্ধি হইলো অর্থ-সম্পদ এদের শুধু অহংকারী করে তুলেছে।ছাত্রের বাবা বলল টাকা নিয়ে টেনশন নাই আমার ছেলে পড়ার টেবিলে বসতেই চায় না আপনি সপ্তাহে ৫ দিন আসবেন ছেলে পড়ুক বা না পড়ুক আপনি ২ ঘন্টা ওরে নিয়ে পড়ার টেবিলে বসে থাকবেন।

 

ছাত্র ও ডাকে ভাইয়া, ছাত্রের বাবা-মা ও ডাকে ভাইয়া!! কি এক মসিবত!
পড়ানো শুরু করলাম, কয়েকদিন পর বুঝতে পারলাম ছেলের মাথায় গেম আর কার্টুনের পোঁকায় ভরা। পড়ার টেবিলে বসলে জগতের সবকিছু মাথায় উঁকি দেয়  আর বহু সমস্যা।আমারে বুয়া ৫/৬ ধরনের নাস্তা দেয় আমি ধৈর্য সহকারে সব ২ ঘন্টায় শেষ করি। কিছু দিন খেয়েল করে দেখলাম আঙ্কেল আন্টি ২ জনই বাসায় যত সময় থাকে তত সময়ই ফোনে আর টিভিতে ডুবে থাকে আর বাচ্চাটাও তাদের অনুসারী।

 

মাস খানেক পর বললাম আন্টি রিসানকে বোধ হয় আমি লাইনে  আনতে পারব না। আন্টি বলল ভাইয়া আপনি এ বছরটা চেষ্টা করে যান অন্যদের থেকে ও আপনার কাছে কিছুটা পড়ে।
আমি বললাম আন্টি আমি পড়াব তবে আমার কিছু কথা  আপনাদের শুনতে হবে।
বললাম আপনি আর আঙেল অবসর সময় কি করেন?
বললেন, আমি ত সারাদিন ফ্রী থাকি কাজ ত বুয়া করে। আমার সময় ফোন আর টিভিতেয় কাটে। আর আপনার আংকেল অফিস থেকে এসে ফ্রী সময় টিভি আর ফোন নিয়ে থাকে।

 

আমি বলেছিলাম  আন্টি ছেলেকে যদি পড়ার টেবিলে বসাতে চান তবে অাগামী ১ মাস আমার কথা মত  আপনাদের অবসর সময় পার করতে হবে।
ছেলের পড়াশোনার জন্য তাঁরা সবি পারবে বলল।
আমি তখন বললেন আপনার কাছে কোন উপন্যাস বা গল্পের বই  আছে? থাকলে রিসান যখন  আপনাদের কাছে থাকে তখন  আপনারা ওই বই পড়েন বা না পড়েন তা মোক্ষম বিষয় না কিন্তু বই পড়তেন এমন ভাবে বই ধরে রাখবেন কোন ভাবেই ১ মাস ওর সামনে কেহ টিভি বা মোবাইল ইউজ করবেন না।  আর রিসান ফোন চাইলে বলবেন অামি বই পড়ছি তুমিও পড়ো আমাদের সাথে।
আন্টি রাজি হলেন কিন্তু কোন বই নাই তাদের বাসায় আর কি বই কিনবেন জিজ্ঞেস করলেন।
পরের দিন আমার নিজের কাছে থাকা কয়েকটা বই দিলাম।

 

অক্টোবর মাস পুরো এভাবে চলল, স্টুডেন্টের মধ্যে ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন হয়েছে, এখন কিছুটা মনোযোগী। মজার বিষয় হচ্ছে ১ মাসে আন্টি ১১টা বই শেষ করেছে  আর আংকেল ২ টা। তারপর আরও কিছু বই তাঁরা কিনেছে। পরের মাসে এর মধ্যে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের চান্স পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের চান্স পাওয়াতে ওখানে আর পড়াতে পারি নাই নতুন বছরে।

 

২০১৭ এর বই মেলা চলাকালীন সময়ে আংকেল কল দিয়ে বললেন ভাইয়া আপনি যদি বই মেলায় আসেন তবে জানাবেন আমরা কিছু বই কিনব। একদিন গেলাম কিন্তু লেট হয়ে গেলো। আন্টি উপহার স্বরূপ কিছু বই দিলেন আমায় অার তাদেরও কেনা বই দেখালো। বই চয়েস দেখে কিছুটা অবাক হলাম। তাদের ব্যাবহার অনেকটা ভিন্ন এখন।

 

এর পর গত ৪ বছরে কথা হয়েছে ২ বার কিন্তু তাদের বাসায়  আর যাওয়া হয়ে উঠেনি। আংকেল কিছুদিন অাগে কল করে জানলো তাঁরা নতুন ফ্ল্যাট কিনেছে  আর স্টুডেন্ট নাকি  আমায় দেখতে চায় আমি একটু সময় করে যেন যাই। বাসার ঠিকানা ও দিলেন।
সেদিন শ্যামলী একজনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম বলল ঘন্টা দুয়েক দেরি হবে। চিন্তা করলাম ছাত্রের বাসা থেকে তাইলে ঘুরে  আসি। কল না দিয়েই চলে গেলাম বাসায়। কলিং বেল দেওয়ার পর ছাত্র দরজা খুলল। অনেক বড় হয়ে গেছে প্রথমে চিনতে পারে নাই সে এখন ৮ম শ্রেণির ছাত্র। আংকেল আন্টি ২ জনই বলে উঠলেন স্যার এমন করে সারপ্রাইজ দিবেন চিন্তাও করি নাই! কেমন  আসেন স্যার  আপনি অনেক বড় হয়ে গেছেন।  আমি রীতিমত অবাক!  আগে ৩ জনই ভাইয়া ডাকত এ্যাত বছর পর স্যার বলে ডাকছে!

 

বাসার ডেকোরেশন সুন্দর। চা-নাশতা শেষে আন্টি তাদের সব গুলো রুম ঘুরিয়ে দেখালেন। তাদের ব্যবহার কথা খুব গোছানো এবং অমায়িক। রুমের দেয়াল এবং প্রতিটা তৈজসপত্রে রুচিসম্মত। একটা প্রবাদ  আছে মেবি, ঘরের কোন জিনিসপত্রই বই এর মত সুন্দর নয়। তাদের বাসায় ৩টা বইয়ের শেলফ। একটা তাদের বেড রুমে সেখানে ২৫০+ বই। একটা ডাইয়িং রুমে, সেখানেও ১৫০+ বই হবে অন্যটা স্টুডেন্ট এর রুমে ওখানে ৫০টার মত বই। আমি রীতিমতো অবাক বই দেখে! জিজ্ঞেস করলাম আন্টি সব বই পড়েছেন? বলল অামার কিছু বই পড়া হয় নি অার  আপনার আংকেল ত সময় পায় না তেমন তাঁর অর্ধেকের মত পড়া হয়েছে।  আর রিসানের ত বাচ্চাদের অনেক গুলো গল্পের বই শেষ করেছে এখন গোয়েন্দা সিরিজ পড়ে। রিসান আগে দুরন্ত ছিলো কিন্তু এখন একদম শান্ত হয়ে গেছে। ২ ঘন্টা তাদের সাথে ছিলাম একটা পরিবার ৪ বছরে এ্যাত পরিবর্তন হবে চিন্তা করি নি।

 

বাসা থেকে বের হব তখন  আঙেল বললেন। স্যার, আমার ছেলেটা গত ২ বছর যাবত স্কুলে ফার্স্ট পজিশনে আছে এছাড়া ও ছবি আকাতে পারে ভাল। আপনার আন্টি আগে ভাতটাও রান্না করতে জানত না এখন টুকটাক সব পারে। আমার আগে অনেক শত্রু ছিলো ব্যবসা কেন্দ্রীক এখন অনেক কমেছে। আগে সবার সাথে সহজে মিশতে পারতাম না এখন পারি এসবের পিছনে আপনার আন্টির অবদান অনেক। আর সবকিছুর পিছনে আপনার যে অবদান তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। আমরা দোয়া করি আপনি আপনার স্বপ্নের সমান বড় হউন। আর যদি কখনো মনে করেন আমরা অাপনার কোন উপকারে আসব সাথে সাথে জানবেন আমাদের। আপনার অবদান আমাদের সাথেই থাকবে চিরদিন।
বাসা থেকে বের হয়ে এক অদ্ভুত ভাল লাগা কাজ করছে। মানব জীবন সরল নাকি জটিল!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *